আমাদের সম্পর্কে

আমাদের শুরুর গল্প

সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকি বলে বন্ধুদের কাছে বেশ নাম ডাক আছে আমার। আমি যে খুব অসাধারণ একজন প্রোগ্রামার তা নয়। কিন্তু অল্প বয়সেই একাধিক কোম্পানিতে চাকরি সুইচ করে আরেক কোম্পানিতে সফটওয়্যারের কাজ করার জন্য নিযুক্ত হওয়াতে আমার নাম বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছিলো বিভিন্ন বন্ধু-মহলে, সেটাতে কোন সন্দেহ নেই। কেউ ঈর্ষা করে, মনে মনে হয়তো নরকেও পাঠাতে চায়, কেউবা আবার খুব সুনাম করে। আমি তখন বিভিন্ন কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করছি, বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠিত মানুষের কাছে গিয়ে শিখতে পারছি এবং তাঁরা আমাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন, সারাদিনে একটু সুযোগ পেলেই Simon Sinek এর Start with Why কিংবা Eric Ries এর Lean Startup এর মতো বইগুলোতে নাক ডুবিয়ে পড়তে পড়তে নাওয়া-খাওয়ার কথা মনে থাকে না, মেধাবী ছাত্র বলে কপালে জুটেছে ইউনিভার্সিটির ফুল স্কলারশিপ, মাস শেষে কোম্পানি থেকে জীবন চালিয়ে নেবার মতো যথেষ্ট ভালো স্যালারি - ১৮ বছর বয়স পার করার আগেই এতকিছু জীবনে চলে এসেছে, আর কিছুর কী দরকার আছ?

এরকম একদিন অফিসে বসেই আমার আরেক সহকর্মী সানজানার (ছদ্মনাম) সাথে UI আর UX এর পার্থক্য নিয়ে তর্ক করছিলাম, এমন সময় অজানা এক নাম্বার থেকে একটি ফোনকল আসলো। আমি তখনো জানতাম না, এই একটি ফোনকল আমার পুরো জীবনটি ওলট-পালট হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেবে।
ফোনটি এসেছে সিলেট থেকে, মাদ্রাসায় পড়ুয়া প্রায় আমার বয়সী এক ছেলে ফোন করেছে। ছেলেটি বেশ কিছুক্ষণ সঙ্কোচপূর্ন গলায় কথা বলে আমাকে যেটি বললো, তার সারমর্ম হচ্ছে,
  • ছেলেটি প্রোগ্রামিং শিখতে প্রচণ্ড আগ্রহী এবং এর জন্য সে একটি ট্রেইনিং সেন্টারে ভর্তি হবার জন্য টাকা জমিয়েছিল।
  • মাত্র কয়েকদিন আগে তার বাবা মারা গিয়েছেন, তাই তার ২ ছোটবোন সহ সমস্ত সংসার চালালনোর দায়িত্ব তার উপরে এসে পড়েছে
  • সংসার চালানোর খরচ চালাতে গিয়ে ট্রেইনিং নেবার জন্য জমানো টাকাটা ব্যবহার করতে হচ্ছে। পরবর্তী দিনগুলোতে সে কী করবে জানে না।
  • এতকিছুর মাঝেও সে ইন্টারনেটে বাংলায় প্রোগ্রামিং শেখার জন্য ফ্রিতে ভালো রিসোর্স না পেয়ে আমাকে ফোন করেছে গাইডলাইনের জন্য
ছেলেটি এই পর্যায়ে বলে যে ভাইয়া আপনি তো অনেক সুযোগ সুবিধার মধ্যে রয়েছেন, আমি তো আসলে সেইরকম সুবিধার মধ্যে নেই। জীবনটা অনেক কঠিন হয়ে গিয়েছে হঠাৎ করে। বলেই ছেলেটি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো এবং সম্ভবত কিছুটা লজ্জা পেয়েই ফোনটি কেটে দিলো। আমি এরপর অনেকবার সেই নাম্বারটিতে কল ব্যাক করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ বলেছে।

আমি অনেক বেশি সুযোগ সুবিধা নিয়ে বড় হয়েছি, এটি সত্যি নয়। আমরা নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে এখন কিছুটা স্বচ্ছল হয়েছে এবং তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব আমাদের বড় ভাইয়ার। চার ভাইয়ের পরিবারে আমাদের সবচেয়ে বড় ভাইয়া যে পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করেছে তার ছোট ভাইদের ভালো জায়গায় পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করার জন্য। এটা আমি না দেখলে বিশ্বাস করা হয়তো সম্ভব হতো না। ছোটবেলা থেকেই তাই বাসায় কোন কিছুর আবদার করার সাহস হয় নি কখনো। জীবনের প্রথম ল্যাপটপটি পেয়েছিলাম জাতীয় প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে। যখন সাংবাদিক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা কী করেন? আমি বেশ ভাব নিয়েই বলেছিলাম, "আমার বাবা বরিশালের কৃষক" । সেটা পেপারে আসার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হওয়া আমার মেজো ভাইয়ের আমাকে সে কি বকা-ঝকা। আমি নাকি তার সম্মান কমিয়ে দিয়েছি।
কাজেই সিলেটের ছেলেটির মনের ভেতর চাপা কষ্ট যখন কান্না হয়ে প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিলো। আমি ঠিকই তার কষ্টটুকু অনুভব করেছিলাম। আমি জানি না যে ছেলেটি কীভাবে আমার ফোন নম্বর পেয়েছিলো। কিন্তু এতটুকু বুঝতে পেরেছিলাম, আমার কিছু একটা করতে হবে।

নিজে যে কোম্পানিতে চাকরি করতাম, সেখানেই প্রথম তুললাম কথাটা। বললাম কোম্পানি যদি আমাকে সাহায্য করে তাহলে, শুধু প্রোগ্রামিং বিষয়টি ফ্রিতে বাংলায় শেখানোর জন্য অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরী করার জন্য আমি প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিতে তৈরী আছি।

কোম্পানি সেটাতে সম্মতি এবং উৎসাহ দিলেও যেহেতু এই প্রজেক্টটি বাদেও কোম্পানির আরও অনেক কিছু আমার সামলাতে হতো, তাই স্বপ্নের প্রোগ্রামিং প্লাটফর্ম নিয়ে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেলো। কিন্তু আমি তখন নাছোড়বান্দা। সময় বাঁচানোর জন্য ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করবো না বলে ঠিক করলাম এবং ইউনিভার্সিটি পড়ার ব্যাপারটি পুরোপুরি ছেড়েও দিলাম। বাসায় প্রচণ্ড বকা-ঝকা তখন আমার উপর। আর আমি তো তখন কারো কথাই কানে নেই না।

দুঃখজনক হলেও আমার আগের প্রিয় কোম্পানিতে আমার পক্ষে ২ বছরের বেশি আর কাজ করা সম্ভব হলো না। প্রোগ্রামিং শেখার প্লাটফর্ম তৈরী করতে পারি নি, কোন ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছি না তখন, সাথে নেই কোন চাকরি, তাই নেই কোন মাসিক নিশ্চিত স্যালারি । চোখেমুখে অন্ধকার দেখা শুরু করলাম। এরপর প্রচণ্ড হতাশা ঘিরে ধরলো আমাকে। সাথের সব ফ্রেন্ডদের গ্র্যাজুয়েসন এর প্রথম ২ বছর কমপ্লিট। আর আমি নিশ্চিত ১০০% স্কলারশিপ হারিয়ে বসে আছি। এর সাথে আরও অনেক জটিল বিষয় আমার জীবনে তখন খেলা করছে। কাছের ফ্রেন্ডরা সাপোর্ট দেবার ট্রাই করে। BMA থেকে মিলিটারি ট্রেইনিং থেকে ফ্রেন্ডরা ফোন করা সাহস দেয়। আমার মাথায় তখন ১০১ টা দুশ্চিন্তা। পাহাড়সম জটিলতা ছেয়ে গিয়েছে আমার ছোট্ট জীবনে। যেগুলো আমি সব এখানে বলার জায়গা নেই।

না পারছিলাম সহ্য করতে, না পারছিলাম কাউকে বলতে। এর কিছুদিন পরেই শুকনো মুখে বাসায় ফিরে আসলাম। সেই বড় ভাইয়া আর সেজো ভাইয়াই সাহস দিলেন আমাকে। বললেন, যেকোন ধরণের সহযোগিতা তারা আমাকে করবেন কিন্তু আমাকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে। নিজের থেকে কয়েক বছরের জুনিয়রদের সাথে কীভাবে খাপ খাওয়াবো ভেবে আরও হতাশ হয়ে গেলাম।

এরকম একদিন মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে গিয়েছি ফ্রেন্ডের সাথে। তখন মসজিদের ইমাম সাহেব একটি কথা কানে আটকে গেলো,

"আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেন না। সে যা ভালো কাজ করেছে তার ফল পাবে এবং যা খারাপ করেছে তা তার বিরুদ্ধে যাবে।" - [আল-বাক্বারাহ ২৮৬]

আমি যে প্রচণ্ড ধার্মিক ব্যাপারটা সেরকম নয় কিন্তু আয়াতটি মাথায় আটকে গেলো। সিলেটের সেই ফোন কলটির কথা মনে পড়লো। সিদ্ধান্ত নিলাম যে নিজেই সফটওয়্যার কোম্পানি শুরু করবো বাংলায় প্রোগ্রামিং শেখার ফ্রি অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরী করার জন্য। বিন্দুমাত্র আইডিয়া নেই যে কোথায় কীভাবে শুরু করবো, টিম মেম্বার কোথায় পাবো, স্যলারি দেব কেমন করে। নিজে প্রোগ্রামিং পারি আর গত ৩ বছরের ইন্ডাস্ট্রি এক্সপেরিয়েন্সকে পুঁজি করে নেমে পড়লাম কাজে। প্লাটফর্মে মূলত (মেইনলি) আমরা কোডিং শেখানোর কাজ করবো, এটাকে মাথায় রেখে নাম দিলাম Mainly Coding, আর ডোমেইন কিনলাম MainlyCoding.com অ্যাড্রেসে।
খুঁজে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, IUT, BUP আর Ulab থেকে মিলিয়ে ৫ জন টিম মেম্বার হলো আমাদের। সবাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম দিককার শিক্ষার্থী। এক্সপেরিয়েন্স সবার হয়তো ছিল না, কিন্তু চোখে মুখে স্বপ্ন, উৎসাহ আর আগ্রহের কোন কমতি ছিল না। খুব সাহস নিয়ে কাজে নেমে পড়লাম এই টিম নিয়েই।

ট্রেড লাইন্সেস কর্মকর্তা আমাকে যখন লাইসেন্স দিচ্ছিলেন, তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, "বাবা, তোমার বয়স কত?"
আমি বললাম, "১৮ বছর পার করছি এখন আংকেল"।
তিনি মুখে হাসি ফুঁটিয়ে বললেন, "তুমি আমার দেখা সবচেয়ে কম বয়সী আইটি উদ্য্যোক্তা, দেশটা মনে হয় আসলেই এগিয়ে যাচ্ছে "

শেষ কথা

প্রথম অবস্থায় বিভিন্ন কোম্পানির সাথে কন্ট্রাক্টে প্রজেক্টের কাজ করেছি। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল টাকা জমিয়ে MainlyCoding.com এর পেছনে ব্যয় করা। বয়স কম বলে তেমন গুরুত্ব পেতাম না। তাও কোনভাবে একটা কন্ট্রাক্ট পেলেই সর্বোচ্চ দেবার চেষ্টা করেছি।

এখন আমাদের সম্পূর্ণ টিম ভার্সিটির ক্লাসের সময়টুকু বাদ দিয়ে ফুল টাইম Mainly Coding এর পেছনে দিচ্ছে। Lean Startup methodology ফলো করে আমাদের কাজের একটা বড় অংশ যায় ইউজারদের ফিডব্যাক শুনে শুনে সে অনুযায়ী প্লাটফর্মটাকে সাজানোর লক্ষ্যে। এখনো অনেকদূর যাওয়া বাকি। আমি বলি যে, আমরা এখনো শুরুই করতে পারি নি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিং শেখার সবচেয়ে বড় কন্টেন্ট হাব তৈরি করা এবং একইসাথে আমাদের শিক্ষার্থীদেরকে অসাধারণ পাসোনলাইজড লার্নিং এক্সপেরিয়েন্স তৈরী করে দেয়া।

ব্যাপারগুলো অনেক বেশি জটিল, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, "আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেন না।"

প্রতিষ্ঠাতা, মেইনলি কোডিং
৩ জুলাই, ২০২০
যুক্তরাষ্ট্র
hello@mainlycoding.com
Mainly Coding Logo

hello@mainlycoding.com

+880 1758122257

House: 146, Baunia Bazar
Main Road, Turag, Dhaka 1230

Payment Partners

bKash PaymentNagad Payment

সকল কন্টেন্ট বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, 2000 অনুযায়ী সংরক্ষিত | বিনানুমতিতে এই সাইটের অন্তর্ভুক্ত কোন কন্টেন্ট নিয়ে অন্য কোথাও পাবলিশ করা আইনত দণ্ডনীয়।

© Mainly Technology All rights reserved